করোনা প্রসঙ্গ : প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোঃ হারুন অর রশিদ’র সাক্ষাৎকার

গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চীনে প্রথম কোভিড-১৯ এর রোগী শনাক্ত করা হয়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই নভেল করোনা ভাইরাস প্রায় পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে ফেলেছে। কোন রাষ্ট্রীয় বর্ডার এর গতি রোধ করতে পারছে না। বর্তমানে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখ ছুই ছুই, মৃত্যু ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। সরকারি হিসাব মতে এখনো আমাদের দেশে এর সংক্রমনের হার ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় যায়নি। ৬ জনের মৃত্যু ও ৫৬ জনের আক্রান্তের সংবাদ পাওয়া গেছে। তারপরেও শঙ্কামুক্ত হতে পারছে না বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞসহ সাধারণ মানুষ। শত উৎকণ্ঠা, উদ্বেগসহ হোম কোয়ারিন্টিনের সময়ে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯ এর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ২ এপ্রিল রাতে এক অডিও সাক্ষাতকার দিয়েছেন অধ্যাপক ডা. মোঃ হারুন অর রশিদ। তিনি বাংলাদেশের প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, বর্তমানে ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সক্ষাতকারটি সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করেছেন প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক তানিয়াহ মাহমুদা তিন্নি।

তিন্নি:  পেশাগতভাবে একজন চিকিৎসক হওয়ায় কোভিড-১৯ এর ব্যাপারে  সাধারণ মানুষের থেকে আপনার আরও বেশি জানা বোঝার সুযোগ রয়েছে । করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান আবস্থা সম্পর্কে কি ধারণা করছেন?

ডা. রশিদ: ব্যাপার হচ্ছে এই ভাইরাস তো আমাদের এখানে ইম্পরটেড একটা ভাইরাস, এটা তো আমাদের এখানে ছিল না। বাইরে থেকে এসেছে। এখন প্রথমেই দেশের বাইরে থেকে এয়ারপোর্ট হয়ে যারা দেশে ঢুকল তাদেরকে যখন আমরা ঢুকতে দিয়েছি, মূলতঃ তখনই এটা সারা দেশে ছড়িয়েছে। যদিও ৮ মার্চে প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত একজন ডিটেকটেড হয়েছেন তারপর সংখ্যাটা কিন্তু তেমন বাড়েনি। এখন জানিনা ভবিষ্যতে কোন জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। সরকার থেকে যে তথ্যটা দেওয়া হচ্ছে, মানে আইইডিসিআর যে তথ্যটা দিচ্ছে, সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে ৫৬ জন আক্রান্ত। অর্থাৎ সংখ্যাটা এখনও অনেক কম।

তিন্নি: কোভিড ১৯ মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

ডা. রশিদ: সরকারের পদক্ষেপগুলো তো একটু এলোমেলো হয়েই গেছে। যে সময়টা সরকার পেয়েছে মানে চীনে যখন ছড়িয়েছে এবং আমাদের দেশে আসতে পারে এরকম আশঙ্কা ছিলই। সেটার জন্য যে ধরনের প্রস্তুতির দরকার ছিল সেটা সরকার যথাসময়ে নেয়নি। তারা শুধু ব্রিফিং করা ছাড়া আর কিছু করেনি। প্রথম যখন একজনকে শনাক্ত করা হয়, তখন দেখা যাচ্ছে সরকারের হাতে টেস্টিং কীট মাত্র দুই হাজার এবং হাসপাতালগুলো ঐভাবে প্রস্তুত ছিল না। প্রস্তুতিগুলো এখনও যথেষ্ট নয়। যদি আমরা এখান থেকে পরিত্রাণ পেয়ে যাই তাহলে তো ভাল! কিন্তু কোনক্রমে এটা আমাদের নাগালের বাইরে চলে গেলে তখন যে সমস্যাটা হবে সেটা হল আমরা টেস্ট করবার সুযোগ সুবিধা থেকে যেমন বঞ্চিত হব তেমনি চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের সক্ষমতার সংকট প্রকট আকারে দেখা দেবে। সেটা করার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেটা বারবার বলছে ব্যাপক হারে আমাদের টেস্ট করা দরকার সেই দিক থেকে সরকারের তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছেনা।

তিন্নি: কিন্তু সরকারের যে অন্যান্য পদক্ষেপগুলো বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি, সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা কার্য্ত লক ডাউন ইত্যাদির ফলে আমরা কতটুকু সুবিধা পাব?

ডা. রশিদ: প্রথম কথা হল যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ না থাকত তাহলে যে জিনিসটা হত শিক্ষার্থীরা যেহেতু ক্লোজ কন্টাক্টে থাকে সেক্ষেত্রে কেউ একজন আক্রান্ত হলে অন্যদেরও সংক্রমণের সম্ভবনা থাকে, সেদিক থেকে এটি একটি যথার্থ সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়ত, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে গ্রাজুয়ালি এটাও ভালো একটা পদক্ষেপ।  সেখানে কিন্তু ত্রুটি থেকেই গেল। অন্যান্য শহরের কথা বাদ দিলাম খোদ ঢাকা শহর থেকে একটা হিসেব মতে লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্রামে চলে গেছে। অনেকের ধারনা ঢাকা থেকে প্রায় নব্বই লক্ষ মানুষ চলে গেছে। যদি তা হয়ে থাকে এদের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তি থাকলে সেটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা থেকে যায়।

এক্ষেত্রে কিছু সেলফ কন্ট্রাডেক্টরি বিষয়ও ছিল যেমন-  যদি  হল বন্ধ করে দেওয়া হয় তাহলে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই শহর ছাড়তে হবে, একইভাবে নিম্ন আয়ের মানুষদের অবস্থা এবং অবস্থান নির্ভর করে কাজের সাথে। কাজ না থাকলে তাদের শহরে থাকার কোন সুযোগ নাই। ফলে তাদের চলে যেতেই হবে। কোন উপায় কিন্তু ছিল না।

তিন্নি: আপনি এইমাত্র যে শ্রমজীবী মানুষদের কথা বললেন তাদের ক্ষেত্রে আমাদের মত দেশে হোম কোয়ারিন্টিন কতখানি বাস্তবসম্মত?

ডা. রশিদ: হোম কোয়ারিন্টিন দুনিয়াব্যাপী কম বেশি হচ্ছে।কিন্তু হোম কোয়ারিন্টিনের অন্যতম পূর্বশর্ত হল মানুষ যাতে অনুভব করে তাঁর খাদ্য, চিকিৎসা এবং অন্যান্য যে প্রয়োজনীয় উপকরণ সেগুলো সে নিশ্চিন্তে পাচ্ছে। সেটা যদি না পায় তাহলে মানুষ বেরিয়ে যাবে বা বেরিয়ে যেতে বাধ্য। সেই কাজটা আমাদের সরকার তা করতে পারেনি।এক্ষেত্রে সফলতার পরিচয় দিয়েছে চীন।

তিন্নি: আইইডিসিআর তো দুই মাসের বেশী সময় ধরে টেস্ট করাচ্ছে এবং নিয়মিত যে তথ্য দিচ্ছে তাতে অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবাই কম সংখ্যক রোগী পাওয়া যাচ্ছে তাহলে কি আমরা বলতে পারি বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে?

ডা. রশিদ: এটা বলা মুশকিল। আইইডিসিআর এর বাইরে আমাদের কাছে তো গ্রহনযোগ্য কোন মাধ্যম নেই।যে জিনিসগুলো নিয়ে সন্দেহ পোষণ করা যায় সারা দেশে সর্দি কাশিতে বেশ কিছু রোগী মারা যাচ্ছে।যদিও আইইডিসিআর বলছে মৃত্যু পরবর্তী নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছে এবং এদের অধিকাংশেরই কোভিড-১৯ নাই। কিন্তু এখানেই এক ধরনের বিশ্বাস যোগ্যতার সংকট থেকে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে এ সময় দৃশ্যমান বিশ্বাস যোগ্যতার বিষয় থাকতে হবে সেটা না থাকলে মানুষের মনে সন্দেহের উদ্রেক হওয়াটাই স্বাভাবিক।সেই বিশ্বাস যোগ্যতাটা এখনও সরকার বা আইইডিসিআর অর্জন করতে পারেনি।  

ছবি: সংগৃহিত

তিন্নি: পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছর এই ঋতুতে বেশ কিছু মানুষ শ্বাসকষ্ট জনিত রোগে মারা গিয়েছে তো সেই জায়গা থেকেও বলা যায় এই রোগীগুলোও কোভিড-১৯ নয় বরং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় মারা যাচ্ছে।

ডা. রশিদ: যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে পারছি না ততক্ষণ তো আসলে বলা সম্ভব নয় । আপনার হাতে যদি প্রমান না থাকে তাহলে তো আপনি বলতে পারবেন না। সন্দেহ করা যেতে পারে , উদ্বেগ হতে পারে কিন্তু বলা তো যাবেনা!

তিন্নি: কোভিড-১৯ এর যথাযথ ব্যবস্থা আমাদের চিকিৎসা খাতের সক্ষমতা কতখানি? বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো যেখানে লাশের মিছিল কমাতে পারছে না।

ডা. রশিদ: কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা আসলে কয়েক ধরনের। কিছু ক্ষেত্রে শুধু প্যারাসিটামল এবং পানি খেয়ে রোগী ভালো থাকবে, কিছু রোগীদের ক্ষেত্রে স্যালাইন লাগবে, কিছু রোগীরা যারা শকে চলে যাবে তাদের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক বা অন্যান্য ঔষধ লাগবে, কিছু ক্ষেত্রে ভেন্টিলেটর লাগবে। এখনও আমাদের দেশে এমন কোন ক্রাইসিস পিরিয়ড তৈরি হয়নি যে আমরা সেটা মোকাবেলা করতে পারব না। সংখ্যা যদি এরকমি থাকে তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু সংখ্যা ইতালির মত হলে আমাদের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাবে। তবে লাশের মিছিল আটকাতে পারছি কিনা তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ আমরা রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারছি কিনা।

তিন্নি: কিন্তু এখানেই আরেকটা প্রশ্ন চলে আসে গণমাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি অনেকে আইইডিসিআর এ ফোন করে সেবা পাচ্ছেন না আবার  কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে করোনা আতঙ্কে হাসপাতালে নেয়া হয়নি অথবা চিকিৎসা পয়নি এই বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

ডা. রশিদ: এখানে একটা জিনিস আমাদের মাথায় রাখা দরকার কোভিড-১৯ যে বাংলাদেশে অলরেডি ঢুকে গেছে ফলে টোটাল সিনারিও পাল্টে গেছে। চাইলেও হেলথ সেক্টরকে আগের মত রাখা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় এই সেন্সে যে সাধারণভাবে চীনে যে কাজটি করেছে তারা তাদের উহানের সব হাসপাতালে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা করায় নি। কয়েকটা ডেডিকেটেড হাসপাতালে তারা চিকিৎসা করেছে। চিকিৎসকদেরও কিন্তু এক জায়গায় নিয়ে এসেছিল তারা।  আমরা যদি সারা শহরেই করোনা চিকিৎসা করতে চাই এটা কোনভাবে সম্ভব নয়। যদি উদাহরণ হিসেবে বলা যায় হার্নিয়া বা এই ধরনের অপারেশন এখনও করা যায় ছ’মাস পরেও করা যায়। এই রোগীদেরকে এভয়েড করাই যেতে পারে এই মুহূর্তে। আবার আমাদের ক্লিনিকগুলোতে রোগীরা যায় ডাক্তাররা চিকিৎসাও করান এইভাবেও কিন্তু চিকিৎসা করা উচিৎ নয়। অন্যান্য দেশে যেমন আলাদা করে শ্বাসকষ্ট ক্লিনিক করেছে, ফিভার ক্লিনিক করেছে সেখান থেকে রোগীদের পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বিচ্ছিন্ন করে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এইভাবে যদি করা না যায় তাহলে আমরা রোগীদের সঠিক চিকিৎসা দিতে পারব না।

তিন্নি: আপনি যেহেতু বিশেষায়িত হাসপাতালের কথা বলছেন চীনেও বিশেষায়িত হাসপাতালগুলো তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশেও আমরা দেখতে পাচ্ছি ইতিমধ্যে সরকারের সাথে শিল্পপতি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে। বসুন্ধরা গ্রুপ আকিজ গ্রুপ দুটি হাসপাতালর বাননোর অনুমিতি পেয়েছে এটা কি অগ্রগতি নয়?

ডা. রশিদ: এখানে যে সংকটটা হবে বেসরকারি খাত এগিয়ে আসলেও যদি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব না থাকে তাহলে সেটা জনগনের কোন কাজে লাগবে না। এটা নিয়ে যদি আমরা বিপননের জায়গায় চলে যাই তাহলে মানুষ সেটা এফোর্ড করতে পারবে না। উদাহরন হিসেবে আমি একটা কথা বলি, আমাদের এখানে আইসিইউ নেয়ার জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে রোগীর পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ হয়, মানুষের এখন নিজের কোন কাজ নাই, ব্যাংক বন্ধ হয়ে আছে এই যে সিচুয়েশন, এখন যদি আইসিইউতে ১০/১২ দিন থাকতে হয় তাহলে তো সমস্যা। আর পাঁচ হাজার টাকার নিচে প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউ কিন্তু এভয়েলেভল না। ফলে সর্বনিম্ন টাকার আইসিইউও কিন্তু মানুষ এফোর্ড করতে পারবে না। সেজন্য সরকারের কর্তৃত্ব থাকা এবং কোভিড-১৯ আক্রান্ত যারা আসবে সেটা সরকারি বা বেসরকারি যে কোন হাসপাতালেই আসুক না কেন ফ্রি অফ কস্ট করতে হবে। লাগলে ঐটার টাকা সরকারকে পে করতে হবে। তাছাড়া এ ধরনের হাসপাতাল আমাদের কাজে আসবে না।

তিন্নি: এই যে বারবার আইসিইউ  ও ভেন্টিলেটরের কথা আসছে; করোনার চিকিৎসার জন্য কি সর্বাগ্রে আইসিইউ প্রয়োজন?

ডা. রশিদ: না সমস্ত রোগীর আইসিইউ লাগবে না, ভেন্টিলেটরও লাগবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে লাগবে। কিন্তু প্রয়োজন পড়তে পারে। আইসিইউ কথাটার মানেই হচ্ছে নিবিড় পর্যবেক্ষণ । অর্থাৎ চিকিৎসকরা বার বার রোগীকে দেখবে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। কোভিড-১৯ এর একটা বৈশিষ্ট্য হল এটা আমাদের শ্বাসযন্ত্রের মধ্যে এক ধরনের জলীয় পদার্থ নিঃসরণ করে সেটা অনেকটা ঘন। এটা থাকার ফলে রোগী অক্সিজেন নিতে পারে না। এরকম সিচুয়েশনে আমরা যদি ভেন্টিলেটর না রাখতে পারি তাহলে রোগীরা কিন্তু শ্বাস নিতে পারবে না এবং মারা যাবে। এই সমস্ত রোগীদের জন্য আইসিইউ প্রয়োজন পড়বে। প্রত্যেকটা রোগীর জন্য নয়। একটি টিভি চ্যানেলে দেখলাম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ইংল্যান্ডের কোভিড আক্রান্ত একজনকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্যারাসিটামল, পানি, মধু এগুলোর মাধ্যমেও কিন্তু চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

তিন্নি: গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের তৈরিকৃত কোভিড-১৯ পরীক্ষার কীট কতটুকু কাজে আসবে?

ডা: রশিদ: আইইডিসিআর যে কীটটা ব্যবহার করছে এটা হল আরটি-পিসিআর অর্থাৎ রোগী আক্রান্ত হওয়ার যেকোন দিন সেটা কোভিড-১৯ ডিটেক্ট করবে। আর গণস্বাস্থ্য যে কীট নিয়ে আসবে সেটি কিন্তু পাঁচদিন বা ছয়দিন পরে ডিটেক্ট করতে পারবে। দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আর গণস্বাস্থ্য ঐ কীটটা এপ্রিলের মাঝামাঝি বা শেষের আগে বাজারে এটা নিয়ে আসতে পারবে বলে আমার মনে হয়না।

তিন্নি: ডব্লিউএইচও টেস্টের উপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে আবার আপনিও এর আগে সেটাই বলেছেন। কিন্তু জাপান তো তুলনামুলক কম টেস্ট করিয়েছে এবং এখনো অনেকথানি তাদের নিয়ন্ত্রণে বলছে, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

ডা. রশিদ: জাপান একটা এক্সেপশন, তারাই শুধু কম টেস্ট করিয়েছে। কিন্তু কম টেস্ট করলেও সেটার পরিমান আমাদের থেকে অনেক বেশি। তারা ১০ লক্ষ লোকের জন্য ৬০০ মানুষকে আবার দক্ষিণ কোরিয়া ১০ লক্ষের মধ্যে সাড়ে সাত হাজার মানুষের টেস্ট করিয়েছে সেটা তুলনা করলে আমরা জাপানের কাছাকাছিও যেতে পারিনি এটা এক নম্বর ব্যাপার। আর দুই নম্বর পয়েন্ট হল জাপানের একটা ফ্যালাসি আছে অনেকে মনে করে ২৪ তারিখ অলিম্পিক বাতিলের আগ পর্যন্ত অলিম্পিক যাতে হয় সেটার জন্য তারা কোভিড কম ডিটেক্ট করছে । কথাটা হয়তো সত্যি নয়, কিন্তু এটা প্রচলিত আছে। তিন নম্বর পয়েন্ট হল তারা বলছে তাদের সক্ষমতা রয়েছে সেটা তারা ধরে রাখছে প্রয়োজন পড়লে পুরো সক্ষমতা কাজে লাগাবে। ফলে আমাদের এখানে যদি সরকার বলে আমাদের সক্ষমতা রয়েছে চাইলে এটা কাজে লাগাতে পারব তাহলে মানুষ সেটা গ্রহণ করবে নিশ্চয়ই। কিন্তু সরকার কি সেটা করছে?  

দক্ষিণ কোরিয়ায় বুথ বসিয়ে ব্যাপক হারে কোভিড-১৯ এর টেস্ট কারাচ্ছেন চিকিৎসাকর্মীরা ( ছবি: সংগৃহিত)

তিন্নি: ইউরোপ ও আমেরিকা করোনার ফলে মৃত্যুর মিছিল থামাতেই পারছে না এই ক্ষেত্রে তাদের কোন সংকটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন।

ডা রশিদ: কোভিড-১৯ কে বলা হচ্ছে নভেল করোনা ভাইরাস। অর্থাৎ এর চরিত্র সম্পর্কে আমরা ততটা পরিস্কার হতে পারছিনা। সেজন্য অনেক প্রশ্ন থেকেই যায়। একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে শীত প্রধান দেশে এর সংক্রমণের হার এখনও বেশি। অন্যান্য জায়গায় তুলনামূলক কম। তবে এটা নিয়ে যদি আবার সরকার আত্মতৃপ্তিতে ভোগে তাহলে বুমেরাং না হয়ে যায়। যেমন- ইতালি, স্পেন তারাও ইনিশিয়ালি নেগলেক্ট করেছে। একেকটা দেশের জিওগ্রাফি, আবহাওয়াগত কারণে অবশ্যই কিছু পার্থক্য থাকে কিন্তু প্রমানিত না হলে কোন কিছু ভুল তথ্য উপস্থাপন করলে জনগন বিভ্রান্ত হতে পারে।

তিন্নি: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এর সংক্রমনের প্রভাব কতবেশি পড়তে পারে?

ডা. রশিদ: সংকটটা হল অন্যান্য দেশগুলোতেও শুরুতে আক্রান্তের হার কম ছিল হুট করে বেড়েছে। এখন আমরা যদি বাংলাদেশ বা ভারতের কথা বলতে চাই দুটোই ডেন্সলি পপুলেটেড কান্ট্রি। ভুলক্রমে যদি ইউরোপের মত ছড়িয়ে যায় আমাদের অবস্থা কিন্তু তাদের থেকেও খারাপ হবে। কিন্তু আবহাওয়া বা অন্য কোন কারণে যদি সেইফ হয়ে যায় তাহলে ভালো।

তিন্নি: সারা বিশ্বের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের দেশে চিকিৎসার জন্য কি কি পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

ডা. রশিদ: সরকারের সক্ষমতা আরও বাড়ানো দরকার। এখন পর‌্যন্ত যে টুকু টেস্ট করে আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি আক্রান্তের পরিমান বেড়ে গেলে কিন্তু আমরা তা দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে পারব না। বেশি মানুষ আক্রান্ত হলে আরও বেশি টেস্ট প্রয়োজন পড়বে। এই সক্ষমতা আছে কিনা সেটা সরকারই পরিস্কার করতে পারবে। যেমন- ইউএসএ বলছে এক মিলিয়ন লোককে তারা টেস্ট করিয়েছে। সেটা নিয়েও ক্রিটিক চলছে, প্রশ্ন উঠছে যে সময়ের মধ্যে তারা এক মিলিয়ন টেস্ট করিয়েছে সেটাও কিন্তু কম। সেদিক থেকে আমাদের তো সক্ষমতা নেই বললেই চলে। আবার আমাদের ভেন্টিলেটর কতখানি আছে সেটা বাড়ানো যায় কিনা, দেশে ভেন্টিলেটর তৈরি করা যায় কিনা তাও দেখা দরকার। যেমন- দেশে পিপিই তৈরি হচ্ছে। আবার কীটস তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা দরকার। দুনিয়াব্যাপীই কীটের সংকট রয়েছে, চাইলেই আপনি একসাথে অনেকগুলো কীট কিনতে পারবেন না। আমাদের টেকনোলজিস্ট আছে, সায়েন্টিস্ট আছে, সবাই মিলে ভাবলে অবশ্যই নতুন কিছু করা সম্ভব।  গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র করছে, করুক না এর বাইরে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউক্লিয়ার এনার্জি রিসোর্স সেন্টার আছে, বুয়েট আছে, আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান আছে। সবাই মিলে চেষ্টা করলে সেটা সম্ভব বলে আমি মনে করি।

তিন্নি: আমাদের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি? এই সময় সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার জন্য কি করণীয়?

ডা. রশিদ: আগামী ছয় মাসের জন্য সমস্ত চিকিৎসা খাতকে সরকারের ব্যাপক নজরদারিতে নিয়ে আসতে হবে। আর আগেও যেটা বলেছি কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা কে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান এই রোগগুলোর চিকিৎসা করাবে। একটা হাসপাতাল শুধু ডায়রিয়ার জন্য করে দেন, কোনটা শ্বাসকষ্টের জন্য। এভাবে বিচ্ছিন্ন করতে পারলে চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও সমন্বিত হবে।

তিন্নি: এর বাইরেও আপনার যদি কিছু বলার থাকে….

ডা. রশিদ: বিভিন্ন জায়গায় আমরা দেখতে পাচ্ছি একটা পেশার মানুষের সাথে অন্য পেশার মানুষকে মুখোমুখি দাড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। এটা একটা ন্যাশনাল ক্রাইসিস, একসাথে কাজ করতে হবে। জারনালিস্টের কিন্তু একটা ভূমিকা আছে, পুলিশেরও ভূমিকা আছে। আমরা যদি কাউকে আইসলেশনে রাখতে চাই পুলিশের সাহায্য নিতে হবে। কোন কোন দেশে পুলিশরা যে ডিউটি করছে তাদের টানেলের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেই টানেল ডিজিনফেক্টেড করা হয় । তাদের সাথে যেন জীবাণু না থাকে। পুলিশ তো অনেক মানুষের সংস্পর্শে যায়, তাদেরকে তো নিরাপদ রাখতে হবে। এরকম সকল জিনিসগুলো সমন্বিতভাবে দেখভাল করলে সংকট কমে আসবে।

আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখন যেহেতু হোম কোয়ারেন্টিনে আমরা আছি তাই সারাক্ষণই যাতে আমরা এটা নিয়ে আতঙ্কে না থাকি বরং নিয়মিত ব্যায়াম করা, বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা যেগুলো বলছে সেগুলো মেনে চলা ইত্যাদি জরুরী। এর বাইরে অন্য সময় আমরা দেখি বাড়ির নারীদের উপর আমরা অন্য সময় গৃহের কাজগুলো দিয়ে দেই। কিন্তু এসময় যেহেতু ঘরে থাকি ফলে এই কাজগুলোতে সবাই তাদেরকে সাহায্য করলে ভালো হয়। নাহলে দেখা যাবে নারী সদস্যটি কাজ করছে অন্যরা বসে টেলিভিশন দেখছে এক্ষেত্রে পারিবারিক সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা থাকে। সেজন্য বাড়ির কাজগুলোতে অংশগ্রহণ থাকলে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে ঝামেলা থাকবেনা।

তিন্নি: ধন্যাবদ, সুস্থ্য থাকবেন।

6 thoughts on “করোনা প্রসঙ্গ : প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোঃ হারুন অর রশিদ’র সাক্ষাৎকার

  1. সাক্ষাতকারটি পড়ে অনেক উপকৃত হলাম। এজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

    1. খুবই ভাল বলেছেন। পড়লে ভয় কেটে যায়, সাহস যোগায়। এমন লেখাই প্রয়োজন। ধন্যবাদ লেখাটি দেয়ার জন্য। সবাইকে ধন্যবাদ।

  2. খুবই ভাল বলেছেন। পড়লে ভয় কেটে যায়, সাহস যোগায়। এমন লেখাই প্রয়োজন। ধন্যবাদ লেখাটি দেয়ার জন্য। সবাইকে ধন্যবাদ।

  3. ভালো লাগলো সাক্ষাতকারটি পড়ে। আমাদের দেশের চিত্রটাও পরিস্কার করেছেন নির্মোহভাবে। আমরা আরো কি কি সতর্কতা অবলম্বন করতে পারি তা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিলে ভালো হত। ধন্যবাদ অধ্যাপক ডা:হারুন এবং সাক্ষাতকার গ্রহণকারীকে।

  4. পরামর্শ গুলো সুন্দর। আসলে এখন সমন্বিত উদ্যোগ এর বিকল্প নাই। সরকার যতো তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নিবে ততোই মঙ্গল। ধন্যবাদ স্যারকে।

  5. বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অধ্যাপক হারুন সাহেবের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের সম্ভাবনা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা, সার্বিক সমন্বয় ও সহায়তার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা সম্বলিত আশাবাদী বক্তব্য দেশবাসীকে সাহস যোগাবে। সময়োপযোগী আশান্বিত বক্তব্যের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই ও উনার সুস্থতা কামনা করি।

    সাক্ষাৎকার গ্রহনকারীকেও আন্তরিক ধন্যবাদ সুন্দর ভাবে ধারাবাহিক প্রশ্ন করার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

 

ফেইসবুকে আমরা